ঢাকার ব্যস্ত শহরের মাঝেও যদি আপনি খোঁজেন এমন একটি জায়গা, যেখানে খাবারের প্রতিটি কামড়ে পাবেন মধ্যপ্রাচ্যের আসল স্বাদ—তাহলে “Al-Majlis Arabian Restaurant” হতে পারে আপনার পরবর্তী গন্তব্য।
এই রেস্টুরেন্টের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো, এখানে রান্না করেন সরাসরি ইয়েমেন থেকে আসা পেশাদার আরব শেফ। তারা প্রতিদিনের মেনুতে প্রস্তুত করেন আরব বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় কিছু খাবার—যেমন খাবসা, লাহাম হানীথ, মান্দি, আরব রুটি, সুগন্ধি স্যুপ, তাজা সালাদ এবং বিভিন্ন ধরনের আরবিয়ান ডেজার্ট। প্রতিটি পদে ব্যবহার করা হয় আসল আরবিক রেসিপি ও বিশেষ মসলা, যার স্বাদ আর ঘ্রাণ একদম অন্যরকম।
আরো বিস্তারিত দেখতে ইউটিউবে ফুল রিভিউ ভিডিওটা দেখে নিতে পারেন!
রেস্টুরেন্টের পরিবেশ ও বসার জায়গা | Restaurant Ambience & Sitting Area

আল-মাজলিশ শুধু খাবারের জন্য নয়, বরং তার মনোমুগ্ধকর পরিবেশ এবং দৃষ্টিনন্দন সাজসজ্জার জন্যও সমানভাবে জনপ্রিয়। এটি একটি ফাইন ডাইন রেস্টুরেন্ট, যেখানে ঢুকলেই যেন মনে হয় আপনি আরবের কোনো শহরে প্রবেশ করেছেন। রেস্টুরেন্টের ভেতরের আলো, দেয়ালের আরবি নকশা, আর হালকা সুরের আরবিয়ান মিউজিক—সবকিছু মিলে এখানে তৈরি হয়েছে একদম আসল আরবিয়ান অনুভূতি।
এখানে মোট তিন ধরনের বসার ব্যবস্থা রয়েছে, যা প্রতিটি ধরণের অতিথির জন্য আলাদা অভিজ্ঞতা তৈরি করে।
প্রথমত, রেগুলার সিটিং এরিয়া, যেখানে আছে আরামদায়ক চেয়ার ও টেবিল। যারা পরিবার বা বন্ধুর সঙ্গে সাধারণভাবে বসে খেতে পছন্দ করেন, তাদের জন্য এটি আদর্শ।
দ্বিতীয়ত, মজলিশ রুম, যা আল-মাজলিশের অন্যতম আকর্ষণ। এখানে আপনি ইচ্ছেমতো বসে বা শুয়ে আরাম করে খেতে পারেন, ঠিক যেমন করে আরব দেশে মজলিশ ঘরে বসে সবাই একসাথে খাওয়া-দাওয়া করে। নরম ম্যাট, কুশন, এবং উষ্ণ আলো এই রুমটিকে করে তোলে একদম আরামদায়ক ও প্রাইভেট।

সবশেষে রয়েছে পার্সোনাল ডাইনিং রুম, যা বিশেষ কোনো অনুষ্ঠান, জন্মদিন, বা পারিবারিক গেট-টুগেদারের জন্য একদম উপযুক্ত। এই রুমে আপনি পাবেন নিজের মতো করে সাজানো একটি ছোট “হোম ডাইনিং” পরিবেশ—যেখানে রয়েছে ব্যক্তিগত ওয়াশরুম, ডাইনিং টেবিল, কাস্টম কুলিনারি সেট, এবং দারুণ এক ডেকোরেশন।
আসল আরবিয়ান স্বাদের নিশ্চয়তা | Authentic Arabian Taste Guaranteed

ঢাকায় অনেক রেস্টুরেন্ট আছে যারা “আরবিয়ান” ট্যাগ ব্যবহার করে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেসব খাবার তৈরি করেন স্থানীয় শেফরা, যা স্বাদ ও পরিবেশ—দুটোতেই একটা বিশাল ফারাক তৈরি করে।

আল-মাজলিশ রেস্টুরেন্ট এই জায়গাটাই আলাদা করে তুলেছে।
কারণ এখানে রান্না করেন আসল আরবিয়ান শেফ, যারা মধ্যপ্রাচ্য থেকে এসে নিজেরাই প্রতিটি খাবার হাতে তৈরি করেন। খাবারে তাই থাকে আসল আরবের ঘ্রাণ, স্বাদ ও উপস্থাপনা। শুধু শেফই নয়, রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার এবং পরিচালক—উভয়েই আরব দেশের নাগরিক, যারা নিশ্চিত করেন যেন প্রতিটি রেসিপি আরব ঐতিহ্য অনুসরণ করে তৈরি হয়।
রেস্টুরেন্টের পরিবেশে আরও একটি চমৎকার দিক হলো—এখানকার বেশিরভাগ ওয়েটার আরবিতে কথা বলতে পারেন, পাশাপাশি বাংলাতেও দক্ষ। ফলে যদি আপনার সাথে কোনো আরব অতিথি থাকেন, তাদের জন্য এটি হবে একদম হোম-কমফোর্ট অভিজ্ঞতা।
বিশেষ করে ঢাকায় অবস্থানরত আরব দেশের অনেক কূটনীতিক (Diplomats) এবং মিডল ইস্ট থেকে আসা অতিথিরা নিয়মিত এখানকার খাবার উপভোগ করেন। এই বিষয়টিই প্রমাণ করে—আল-মাজলিশ শুধু নামেই নয়, স্বাদ ও পরিবেশ উভয় ক্ষেত্রেই ১০০% আসল আরবিয়ান রেস্টুরেন্ট।
খাবারের স্বাদ ও বৈচিত্র্য | Taste & Variety of Food

মধ্যপ্রাচ্যের খাবার বরাবরই পরিচিত তাদের অনন্য স্বাদের জন্য—আর আল-মাজলিশ রেস্টুরেন্টেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এখানে পরিবেশিত প্রতিটি খাবারে স্পাইসের মাত্রা কম, কিন্তু স্বাদে রয়েছে এক গভীরতা ও পরিশুদ্ধতা।
আরবিয়ান রান্নায় সাধারণত ঝাল খুবই কম থাকে। এখানে খাবারে ব্যবহার করা হয় বিভিন্ন ধরনের কিসমিস, বাদাম, আখরোট, জাফরান, এমনকি কখনো কখনো দুধ—যা একসাথে মিলিয়ে দেয় একদম ইউনিক ও স্বাস্থ্যকর এক ফ্লেভার। এই উপাদানগুলো শুধু স্বাদে নয়, গন্ধ ও টেক্সচারেও ভিন্নতা নিয়ে আসে।
আমাদের অভিজ্ঞতায়, খাবারগুলো ছিল একেবারে ফ্রেশ ও হালকা, এবং মাংসগুলো ছিল দারুণ সফট ও টেন্ডার। এক কামড়েই বোঝা যায়—এগুলো ভালো কোয়ালিটির উপকরণ দিয়ে তৈরি।
তবে এখানে একটি বিষয় মাথায় রাখা দরকার—যারা বেশি ঝাল খাবার খেতে অভ্যস্ত, তাদের কাছে এই খাবারগুলো একটু ফ্ল্যাট বা হালকা লাগতে পারে। আর যদি আপনি কম ঝাল খেতে পছন্দ করেন, হেলদি খাবার খুঁজছেন, কিংবা একটু নতুন ধরনের স্বাদ উপভোগ করতে চান—তাহলে আল-মাজলিশ আপনার জন্য পারফেক্ট জায়গা।
এই খাবারগুলো আপনাকে শুধু তৃপ্তি দেবে না, বরং এক ধরনের পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি ফুড এক্সপেরিয়েন্সও দেবে—যেখানে স্বাদ ও স্বাস্থ্য পাশাপাশি চলে।
আমাদের ট্রাই করা খাবার | Our Tried Dishes

আমাদের ভিজিটে আমরা দুটি স্পেশাল লাহাম-ভিত্তিক খাবার ট্রাই করেছি — লাহাম মান্দি এবং লাহাম হানীথ। দুটি খাবারই ছিল দারুণ স্বাদের, সফট মাংস আর সুগন্ধি চালের মিশেলে একদম মুগ্ধ করে দেওয়ার মতো।
লাহাম মান্দি (Laham Mandi)
লাহাম মান্দি হলো ধোঁয়া ওঠা স্লো-কুকড লাহাম (খাসির মাংস), যেটা ধীরে ধীরে রান্না করা হয়, যাতে মাংস একদম নরম হয়ে যায় এবং সব মশলা ভেতর থেকে ঢুকে যায়।
এই মাংস পরিবেশন করা হয় সুগন্ধি চালের (বেসমতি রাইস) উপর, যার সাথে থাকে হট সস এবং দইয়ের তৈরি ইয়োগার্ট সস।
স্বাদে একদম হালকা, ঝাল নয় — বরং মাংসের নিজস্ব রস এবং ধোঁয়ার ফ্লেভারটা খুব স্পষ্টভাবে টের পাওয়া যায়।
লাহাম হানীথ (Laham Haneeth)

লাহাম হানীথ একটি ট্র্যাডিশনাল ইয়েমেনি রান্না, যেখানে লাহামকে প্রথমে বিশেষ মসলা দিয়ে ম্যারিনেট করা হয়, তারপর সেটাকে ফয়েল বা পাতায় মুড়ে আন্ডারগ্রাউন্ড পিটে ধীরে ধীরে রান্না করা হয়।
এই কৌশলে মাংস এমনভাবে রান্না হয় যেন সেটি মুখে দিলেই গলে যায়। রান্নার সময় কোনো অতিরিক্ত ঝাল বা ভারী তেল ব্যবহার করা হয় না, তাই স্বাদে আসে একধরনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।
এটি পরিবেশন করা হয় সুগন্ধি চাল, হট সস এবং সামান্য লেমন বা সালাদের সাথে।
দাম ও পরিমাণ | Price, Portion & Recommendation

আল-মাজলিশ রেস্টুরেন্টে আপনি খাবার অর্ডার করতে পারবেন দুইভাবে — একদিকে রয়েছে প্ল্যাটার সিস্টেম, অন্যদিকে আলাকার্ট (একেকটি আইটেম আলাদাভাবে) অর্ডার দেওয়ার সুবিধা। যার জন্য আপনি আপনার চাহিদা অনুযায়ী খাবার বেছে নিতে পারবেন।
লাহাম মান্দি প্ল্যাটার (Laham Mandi Platter)
আমরা অর্ডার করেছিলাম একটি লাহাম মান্দি প্ল্যাটার (কোয়ার্টার সাইজ), যার দাম ছিল ৫,৬০০ টাকা।
এই একটি প্ল্যাটারেই আমরা ৪ জন খুব আরাম করে খেয়েছি, এবং আমাদের মতে ৫ জন মানুষ সহজেই এই প্ল্যাটারটি উপভোগ করতে পারবেন।
মাংসের পরিমাণ, রাইসের পরিমাণ—সবই পর্যাপ্ত ছিল, এবং খাবারের গুণগত মান ছিল একদম চমৎকার। যারা ফ্যামিলি বা গ্রুপ নিয়ে যেতে চান, তাদের জন্য এই প্ল্যাটার হবে ভালো অপশন।
ডেজার্ট রিভিউ | Dessert Review
মা’সৌব (Ma’soub)

একটি ট্র্যাডিশনাল ইয়েমেনি ডেজার্ট, যেটা তৈরি হয় কলা, ব্রেড ক্রাম্বস, ক্রিম, মধু ও বাদাম দিয়ে। দামের দিক দিয়ে এটা ছিল ৫৭৪ টাকা, তবে খাওয়ার পর আমাদের মনে হয়েছে হেভি মেইলের পর এই ডেজার্টটা একটু বেশি ভারী লাগে। স্বাদেও খুব আহামরি কিছু না — তাই আমরা এই আইটেমটি খাওয়ার ক্ষেত্রে খুব বেশি রিকমেন্ড করবো না।
মিল্ক কেক (Milk Cake)

এই আইটেমটি ছিল একেবারে অন্যরকম! স্বাদে নরম, হালকা, আর ঠিকঠাক মিষ্টি — খেতে খুশি হয়ে যাবেন। দামের দিক দিয়ে এটি ছিল ২৪০ টাকা, এবং আমরা ব্যক্তিগতভাবে এই আইটেমটি অবশ্যই ট্রাই করার মতো বলেই রিকমেন্ড করবো।
লেট নাইট খাওয়া ও আড্ডার জন্য আদর্শ জায়গা | Perfect Spot for Late-Night Food & Hangout
আল-মাজলিশ আরবিয়ান রেস্টুরেন্ট তাদের পরিবেশ এবং সার্ভিসের কারণে দেরিতে রাত অবধি খাওয়া ও আড্ডার জন্য এক অসাধারণ গন্তব্য।
এই রেস্টুরেন্টে শেষ অর্ডার নেওয়া হয় রাত ১২:৩০ মিনিটে, যা ঢাকার অন্যান্য অনেক ফাইন ডাইন রেস্টুরেন্টের তুলনায় অনেকটাই বেশি।
যারা বন্ধুদের নিয়ে রাতের বেলা ঘোরাঘুরি করেন বা ফ্যামিলির সঙ্গে একটু শান্ত পরিবেশে বসে খেতে চান, তাদের জন্য এই জায়গাটা একদম পারফেক্ট।
আপনি যদি একটু আরামে বসে দীর্ঘ সময় ধরে খাওয়া, গল্প করা, কিংবা আরবিয়ান পরিবেশ উপভোগ করতে চান—তাহলে আল-মাজলিশ আপনার জন্য আদর্শ জায়গা।
তবে যেহেতু এটি জনপ্রিয় এবং আসন সংখ্যা সীমিত, তাই রেস্টুরেন্টে যাওয়ার আগে ফোন করে বুকিং বা অ্যাভেইলিবিলিটি জেনে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। এতে আপনি নিশ্চিত থাকতে পারবেন যে নির্দিষ্ট সময়ে জায়গা পাবেন এবং সার্ভিসও ঠিকঠাক পাবেন।
অবস্থান ও যাওয়ার পথ | Location & How to Get There
আল-মাজলিশ আরবিয়ান রেস্টুরেন্টের ঠিকানা: ২৭ সি/এ, ফয়সাল টাওয়ার, ২য় তলা, রোড-৫২, গুলশান-২, ঢাকা।
ঢাকার যেকোনো জায়গা থেকে আপনি খুব সহজেই এই রেস্টুরেন্টে পৌঁছাতে পারবেন। শুধু গুলশান-২ ট্রাফিক সিগনাল পর্যন্ত আসুন, সেখান থেকে মাত্র ১-২ মিনিটের হাঁটার দূরত্বেই রেস্টুরেন্টটি অবস্থিত।
আপডেটেড মেনু ও সর্বশেষ মূল্য জানার জন্য ভিজিট করুন তাদের ওয়েবসাইট: https://www.almajlisarabianrestaurant.com/



