ঢাকার কোলাহল, ট্রাফিক, আর দমবন্ধ করে রাখা বাতাসের মাঝে কিছুটা প্রশান্তির খোঁজে আমরা মাঝেমাঝেই ছোট ছোট পার্কে কিংবা সবুজ পরিবেশে চলে যাই। এমনি এক স্থান হলো চন্দ্রিমা উদ্যান, যেটিকে অনেকেই জিয়া উদ্যান নামেও চেনেন। জাতীয় সংসদ ভবনের একদম পাশে অবস্থিত এই উদ্যানটি শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই নয়, ইতিহাস আর নান্দনিকতা মিলিয়ে এক অনন্য স্থানে পরিণত হয়েছে।
History of Chandrima/Zia Udyan Udyan চন্দ্রিমা/জিয়া উদ্যানের ইতিহাস
চন্দ্রিমা উদ্যানের যাত্রা শুরু হয়েছিল মূলত ১৯৬৫–৬৬ সালের সময়কালে, যখন ক্রিসেন্ট লেক খননের মাধ্যমে এই অঞ্চলটিকে ঢাকার একটি প্রাকৃতিক কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই লেকের শান্ত জলের পাশে গড়ে ওঠা পার্কটি ছিল তখনকার ঢাকার জন্য এক নতুন নিঃশ্বাস ফেলার জায়গা।
পরবর্তী সময়ে, ১৯৮১ সালে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান আততায়ীর গুলিতে নিহত হলে, তার মরদেহকে সমাহিত করা হয় এই উদ্যানের একটি নিরিবিলি প্রান্তে। এই সময় থেকেই পার্কটি নতুনভাবে পরিচিতি পায় “জিয়া উদ্যান” নামে। অনেকের কাছেই এই নামটা আজও বেশি পরিচিত। জিয়ার সমাধি-সংলগ্ন স্মৃতিস্তম্ভ ও এলাকার সাজসজ্জা উদ্যানটির গুরুত্বকে এক নতুন মাত্রায় নিয়ে যায়।
চন্দ্রিমা উদ্যান তাই শুধু একটি সবুজ পার্ক নয়—এটি ইতিহাস, রাজনীতি এবং নাগরিক জীবনের আবেগের এক সম্মিলনস্থল।
Morning Calm & Evening Crowd সকালের প্রশান্তি ও বিকেলের ব্যস্ততা

প্রতিদিন ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে চন্দ্রিমা উদ্যান যেন এক নতুন প্রাণ পায়।
শত শত মানুষ এখানে আসে সকালের হাঁটা বা জগিং করতে। শরীরচর্চা, দৌড়, কিংবা ধ্যান—প্রতিটি কোণায় যেন সকালের সক্রিয়তা ছড়িয়ে থাকে। ছোটদের জন্য এটি একটি দারুণ স্থান স্কেটিং শেখার ও অনুশীলনের, অনেক বাবা-মা সকালে তাদের সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে এই পার্কে আসেন শুধুমাত্র স্কেটিং প্র্যাকটিস করানোর জন্য।

অন্যদিকে, বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সময়টাতে উদ্যানের চিত্র বদলে যায়। এই সময়ে চন্দ্রিমা উদ্যান হয়ে ওঠে শহরবাসীর আড্ডার এক প্রাণকেন্দ্র।
বন্ধুদের সাথে গল্প, পরিবারের সঙ্গে হেঁটে বেড়ানো, কিংবা প্রেমিক-প্রেমিকাদের হাতে হাত রেখে কিছুক্ষণ নিরিবিলি সময় কাটানো—সবই চলে এই সময়ে। শিশুরাও বিকেলে খেলা, দৌড়ঝাঁপে মেতে ওঠে।
এই দিনভর পরিবর্তনশীল পরিবেশই চন্দ্রিমা উদ্যানকে করে তুলেছে ঢাকার ব্যস্ত জীবনের মাঝেও এক শান্তির ঠিকানা
Must-See Spots in Chandrima Udyan চন্দ্রিমা উদ্যানে দেখার মতো কিছু স্পট

জাতীয় সংসদ ভবনের দৃশ্য (View of the National Parliament House)
চন্দ্রিমা উদ্যান থেকে বাংলাদেশের অন্যতম স্থাপত্য নিদর্শন জাতীয় সংসদ ভবন (জতীয় সংসদ ভবন) খুব কাছ থেকে দেখা যায়। বিশ্ববিখ্যাত স্থপতি লুই কান (Louis Kahn) ডিজাইন করা এই ভবনটির আধুনিক ও জ্যামিতিক নকশা চোখে পড়ার মতো।

ক্রিসেন্ট লেক ও তার উপরে ঝুলন্ত সেতু (Crescent Lake & Hanging Bridge)
চন্দ্রিমা উদ্যানের একক সৌন্দর্যের নাম ক্রিসেন্ট লেক। এটি একটি আধচাঁদের মতো আকৃতির লেক যা পার্কটিকে দুইভাগে বিভক্ত করে রেখেছে। এই লেকের উপর দিয়ে একটি ঝুলন্ত সেতু (Suspension Bridge) পার্কের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাওয়ার পথ তৈরি করেছে।
সেতুটি থেকে পার্কের সৌন্দর্য, লেকের উপর প্রতিফলিত গাছপালা, আর পেছনে সংসদ ভবনের আভাস—সব মিলিয়ে এক অসাধারণ দৃশ্য তৈরি করে।
সন্ধ্যায় লাইট জ্বলে উঠলে এই এলাকা আরও বেশি রোমান্টিক ও ছবির মতো সুন্দর হয়ে ওঠে। অনেকেই এখানে হাঁটতে আসেন শুধু এই ঝুলন্ত সেতুর অভিজ্ঞতা নিতে।

জিয়াউর রহমানের সমাধি প্রাঙ্গণ (Tomb of Ziaur Rahman)
প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধি চন্দ্রিমা উদ্যানের সবচেয়ে পরিচিত এবং ঐতিহাসিক স্থানগুলোর একটি। সাদা মার্বেলের তৈরি এই সমাধি স্থাপত্য একদিকে পরিপাটি ও শান্ত, অন্যদিকে এক ইতিহাসের সাক্ষী।
সমাধি চত্বরটি খোলামেলা, এবং এর চারপাশে গাছ, ফুলের বাগান ও বসার ব্যবস্থা আছে, যা দর্শনার্থীদের জন্য একটি নিঃশব্দ ও শ্রদ্ধাভরে দেখার জায়গা তৈরি করে।
এখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আসেন, অনেকেই শ্রদ্ধা জানাতে, কেউ কেউ শুধু ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখার অনুভূতি নিয়ে।
Advantages of Chandrima Udyan (চন্দ্রিমা উদ্যানের ভালো লাগার দিক)

শহরের ভেতর এমন বিশাল সবুজ জায়গা
ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও ব্যস্ত শহরে চন্দ্রিমা উদ্যানের বিশাল সবুজ পরিসর এক কথায় অবিশ্বাস্য। চারপাশে শুধু কংক্রিট আর হর্নের শব্দের মাঝে এই উদ্যান যেন এক নিঃশ্বাস ফেলার জায়গা। ঢাকার কেন্দ্রস্থলে এতো বড় একটা খোলা পার্ক—এটা অনেকের কাছেই এক আশীর্বাদ। এই সবুজ বিস্তার মানসিক প্রশান্তি দেয় এবং প্রকৃতির সাথে কিছুটা সময় কাটানোর সুযোগ করে দেয়, যা শহুরে জীবনে খুব দরকারি।
প্রশস্ত হাঁটার পথ
উদ্যানজুড়ে রয়েছে লাল ইটের তৈরী প্রশস্ত হাঁটার পথ। সকালে কিংবা বিকেলে হাঁটার জন্য এখানে নিয়মিত অনেকেই আসেন। যারা হাঁটা বা জগিং পছন্দ করেন, তাদের জন্য এটি একটি আদর্শ স্থান। পথগুলো এতটাই প্রশস্ত যে হাঁটার সময় কখনোই ভিড়ের অসুবিধা হয় না। এ ছাড়া যারা স্কেটিং শেখে বা চর্চা করে, তাদের জন্যও জায়গা যথেষ্ট।
প্রাকৃতিক বাতাস ও ছায়া
উদ্যান জুড়ে ছড়িয়ে আছে বড় বড় ছায়াময় গাছ, যা গ্রীষ্মকালেও পরিবেশটাকে ঠান্ডা ও স্বস্তিদায়ক করে তোলে। হাঁটার সময় কিংবা বেঞ্চে বসে বিশ্রাম নেওয়ার সময় সেই প্রাকৃতিক বাতাস আর পাখির ডাক এক স্বস্তিদায়ক অনুভূতি দেয়। অনেকেই এখানে এসে কেবল গাছের ছায়ায় বসে কিছুটা সময় বই পড়েন, গান শোনেন, কিংবা একাকী ভাবনায় ডুবে থাকেন।
এই সবগুলো দিক চন্দ্রিমা উদ্যানকে ঢাকার নাগরিকদের কাছে শুধু একটি পার্ক নয়, বরং এক ধরনের প্রাকৃতিক থেরাপি স্পেস-এ রূপান্তরিত করেছে।
Problems You Might Face (চন্দ্রিমা উদ্যানে কিছু অসুবিধা)
পাবলিক টয়লেট নেই — বিশেষ করে নারীদের জন্য বড় সমস্যা
চন্দ্রিমা উদ্যান এত বড় এবং জনপ্রিয় একটি স্থান হলেও, সেখানে পর্যাপ্ত বা সুপরিচিত পাবলিক টয়লেট নেই।
পুরুষদের জন্য কিছু কাছাকাছি মসজিদের টয়লেট ব্যবহার করার সুযোগ থাকলেও, নারীদের জন্য এটি একটি বড় ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অনেক নারী দর্শনার্থী দীর্ঘ সময় পার্কে থাকতে চাইলেও শুধুমাত্র এই একটি সমস্যার কারণে অস্বস্তি অনুভব করেন বা দ্রুত ফিরে যেতে বাধ্য হন।
ঢাকার এমন কেন্দ্রীয় এবং বিশাল এক পার্কে আধুনিক ও পরিচ্ছন্ন শৌচাগারের অভাব সত্যিই দুঃখজনক।
সন্ধ্যার পর অসামাজিক কার্যকলাপ
যখন সূর্য ডুবে যায়, তখন চন্দ্রিমা উদ্যানের পরিবেশ ধীরে ধীরে পরিবর্তন হতে শুরু করে। দিনের বেলা যতটা প্রাণচঞ্চল আর পরিবার-বন্ধুবান্ধব পূর্ণ, সন্ধ্যার পর সেই স্থানটির কিছু অংশে দেখা যায় কিছু অসামাজিক কার্যকলাপ।
এই সময় পার্কের নির্জন এলাকা গুলোতে কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যবহার যেমন: সন্দেহজনক আড্ডা, অস্বাভাবিক আচরণ বা অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা লক্ষ্য করা যায়। অনেক সাধারণ দর্শনার্থী, বিশেষ করে নারী ও পরিবাররা এই সময়ে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন। এই কারণে, সন্ধ্যার পরে পার্কে ঘোরাফেরা করার ক্ষেত্রে একটু সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
পর্যাপ্ত আলো না থাকা
চন্দ্রিমা উদ্যানের আরও একটি উল্লেখযোগ্য সমস্যা হচ্ছে আলোকস্বল্পতা। সন্ধ্যার পরে উদ্যানের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অংশে আলো পর্যাপ্ত নয়, যার ফলে নিরাপত্তা ও দিক নির্দেশনার ক্ষেত্রে সমস্যা হয়।
তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু উন্নয়ন কাজ হয়েছে — যেমন কিছু নতুন স্ট্রিট লাইট বা পাথওয়ে ল্যাম্প বসানো হয়েছে।
তবুও, পুরো পার্ক জুড়ে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও পর্যাপ্ত আলো নিশ্চিত করা এখনো প্রয়োজন, যাতে সন্ধ্যার পরও দর্শনার্থীরা নিরাপদ ও নিশ্চিন্তভাবে ঘুরে দেখতে পারেন।
A Few Requests for Visitors (ভ্রমণকারীদের প্রতি কিছু অনুরোধ)

পার্কের ভেতর পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন
চন্দ্রিমা উদ্যান আমাদের সবার—a public space that belongs to the people.
এখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ঘুরতে আসেন, হাঁটেন, বিশ্রাম নেন বা প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটান। তাই প্রত্যেক দর্শনার্থীর দায়িত্ব উদ্যানটিকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা।
অনুগ্রহ করে খাবারের প্যাকেট, বোতল, চিপসের মোড়ক, কিংবা অন্য কোনো বর্জ্য যেখানে-সেখানে না ফেলে, নির্ধারিত ডাস্টবিনে ফেলুন। এভাবে আমরা সবাই মিলে পার্কটিকে সুন্দর ও টেকসই রাখতে পারি—পরবর্তী প্রজন্মের জন্যও।
অশালীন আচরণ থেকে বিরত থাকুন, বিশেষ করে শিশুদের সামনে
চন্দ্রিমা উদ্যান একটি পারিবারিক পরিবেশ—এখানে শিশুরা আসে খেলতে, পরিবার আসে বেড়াতে, প্রবীণরাও আসেন একটু নিরিবিলি সময় কাটাতে।তাই প্রেমিক-প্রেমিকাদের প্রতি বিশেষ অনুরোধ থাকবে, পার্কের পরিবেশের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে নিজ নিজ আচরণ সীমিত রাখুন।
শিশুদের সামনে এমন কোনো কাজ বা ঘনিষ্ঠতা প্রদর্শন করবেন না যা তাদের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে বা কুশিক্ষা দেয় আমরা যদি নিজেদের আচরণের মাধ্যমে সম্মান দেখাই, তাহলে অন্যরাও আমাদের সম্মান করবে।
How to Get There (কীভাবে যাবেন?)
চন্দ্রিমা উদ্যান ঢাকার একদম কেন্দ্রস্থলে, জাতীয় সংসদ ভবনের পাশে অবস্থিত, যা শহরের যেকোনো প্রান্ত থেকে সহজেই পৌঁছানো যায়। ঢাকার ভেতর থেকে আপনি সহজেই রিকশা, মোটরসাইকেল বা ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করে এই পার্কে যেতে পারেন। মানিক মিয়া এভিনিউ বা শেরেবাংলা নগর এরিয়া থেকে প্রবেশপথে সহজেই পৌঁছানো যায়।
মেট্রোরেল ব্যবহার করে চন্দ্রিমা উদ্যানে যাত্রা
নতুন সংযোজিত মেট্রোরেল রুটের মাধ্যমে এখন চন্দ্রিমা উদ্যানে পৌঁছানো আরও সহজ হয়েছে। সবচেয়ে কাছের মেট্রো স্টেশন হলো — বিজয় সরণি মেট্রো স্টেশন (Bijoy Sarani Metro Station)। এই স্টেশনে নেমে হেঁটে খুব অল্প সময়েই আপনি পার্কের মূল গেটে পৌঁছে যেতে পারবেন।
চন্দ্রিমা উদ্যানের এই ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতা আমার জন্য দারুণ ছিল। কিছু অসুবিধা থাকলেও সবুজ পরিবেশ, বিশাল খোলা জায়গা, আর শহরের ভিতর একটু শান্তি খুঁজে পাওয়ার জন্য এটি একটি পারফেক্ট স্পট।
আপনিও একবার ঘুরে আসুন—হয়তো আপনার মনও জয় করে নেবে এই সবুজ স্বর্গ।
যদি আপনি চন্দ্রিমা উদ্যান ঘুরে এসে আরেকটি সবুজ, শান্তিপূর্ণ জায়গায় যেতে চান, তবে ধানমন্ডি লেক হতে পারে আপনার পরবর্তী গন্তব্য। ধানমন্ডি লেক সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পড়ে ফেলুন আমাদের এই ব্লগ পোস্টটি



