টাঙ্গুয়ার হাওর সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ জেলায় অবস্থিত বাংলাদেশের একটি বিখ্যাত পর্যটন স্থান ও মিঠা পানির জলাভূমি। প্রায় ১২৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই হাওরকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মিঠা পানির জলাভূমি বলা হয়। স্থানীয়দের কাছে টাঙ্গুয়ার হাওর ‘নয়কুড়ি কান্দার ছয়কুড়ি বিল’ নামেও পরিচিত।
টাঙ্গুয়ার হাওর সুনামগঞ্জ জেলার মধ্যনগর ও তাহিরপুর উপজেলার মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত একটি বিস্তীর্ণ জলাভূমি। মেঘালয় পাহাড় থেকে ৩০টিরও বেশি ঝরনা এসে মিশেছে এই হাওরে, যা এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। দুই উপজেলার ১৮টি মৌজা ও ৫১টি হাওরের সমন্বয়ে প্রায় ১২,৬৬৫ হেক্টর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত টাঙ্গুয়ার হাওর জেলার সবচেয়ে বড় মিঠা পানির জলাভূমি। এর মধ্যে পানিবহুল মূল হাওরের আয়তন প্রায় ২৮ বর্গকিলোমিটার, আর বাকি অংশে রয়েছে গ্রাম, বসতি ও কৃষিজমি। বর্তমানে হাওরের ভেতরে ও তীরে ৮৮টি গ্রাম অবস্থিত, যা এই অঞ্চলের সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত।
আমি একটি ইউটিউব ভিডিও তৈরি করেছি যেখানে আপনি পুরো ১ রাত ২ দিনের টাঙ্গুয়ার হাওর ভ্রমণ দেখতে পাবেন। ইউটিউবে দেখে নিন
কেন টাঙ্গুয়ার হাওর এত জনপ্রিয়?

টাঙ্গুয়ার হাওরের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ এর বিশাল ও অনন্য প্রাকৃতিক পরিবেশ। বর্ষার মৌসুমে পুরো হাওর জুড়ে থাকে নীল পানির ঢেউ, মাঝে মাঝে মাথা তুলে থাকা গাছপালা, আর চারপাশে সবুজের সমারোহ। এই শীতল বাতাস আর প্রকৃতির কোলে হাউসবোটে বসে পুরো হাওর এক্সপ্লোর করার অভিজ্ঞতা ভ্রমণপিপাসুদের কাছে একেবারেই অনন্য করে তোলে।
এখানে আপনি হাউসবোটে (houseboat) থেকে প্রকৃতির মাঝখানে থেকে চারপাশের নীল পানি আর মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। ফলে ভ্রমণকারীরা বর্ষাকালে কিংবা শীতকালে এখানে এসে প্রকৃতির এক অন্যরকম রূপের স্বাদ নিতে পারেন।
টাঙ্গুয়ার হাওরে কখন যাবেন? / When to Visit Tanguar Haor?

বর্ষাকাল, সাধারণত জুন থেকে নভেম্বরের প্রথম অংশ, টাঙ্গুয়ার হাওর ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। এই সময় হাওরে নীল পানি ভরা থাকে, আর হাউসবোটে ভেসে পুরো হাওরের প্রকৃত সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। এছাড়াও, শীতকালে (ডিসেম্বর-ফেব্রুয়ারি) পানি কিছুটা কমে যায়, কিন্তু অতিথি পাখিদের দেখা মেলে এবং চারপাশের পরিবেশ আরও সবুজ হয়ে ওঠে। তাই বর্ষা এবং শীত—দু’টি মৌসুমেই টাঙ্গুয়ার হাওর ভ্রমণের আলাদা আলাদা রূপ উপভোগ করা যায়।
টাঙ্গুয়ার হাওরে কীভাবে যাবেন/How to Get to Tanguar Haor
টাঙ্গুয়ার হাওরে যেতে হলে আপনাকে প্রথমে সুনামগঞ্জে পৌঁছাতে হবে। দেশের যে কোনো জেলাই থাকুন না কেন, সেখান থেকে সুনামগঞ্জের বাস সহজেই পাওয়া যায়। ঢাকার সায়েদাবাদ, আরাম্বাগ বা ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের কাউন্টার থেকে শ্যামলী, ইম্পিরিয়ালসহ অন্যান্য বাস সার্ভিসের এসি ও নন-এসি বাস পাওয়া যায়। নন-এসি বাসে ভাড়া প্রায় ৭৫০ টাকা থেকে শুরু হয়, আর এসি বাসের ভাড়া ১১০০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে হতে পারে।
সুনামগঞ্জে পৌঁছে আপনাকে শুর্মা ব্রিজ এলাকায় নামতে হবে। সেখান থেকে সিএনজি বা অটোরিকশা ভাড়া নিয়ে আনোয়ারপুর বা লাউরের গর পর্যন্ত যেতে হয়, যেখান থেকে হাউসবোটগুলো ছাড়ে। আপনার হাউসবোট যে স্পট থেকে ছাড়বে তা আগেই নির্ধারণ করে নিন, কারণ কিছু বোট আনোয়ারপুর থেকে ছাড়ে, আবার কিছু বোট লাউরের গর থেকে ছাড়ে।
হাউসবোট এবং এর ভাড়া/Houseboat and Its Rental

টাঙ্গুয়ার হাওরের হাউসবোটের অভিজ্ঞতা সত্যিই অনন্য। এখানে ছোট, বড় এবং মাঝারি আকারের বিভিন্ন হাউসবোট পাওয়া যায়। হাউসবোট মানে হলো একটি বড় নৌকার মতো যেখানে নৌকার ওপরেই ছোট ছোট আরামদায়ক রুম থাকে। এই রুমগুলোতে আপনি হাওরের মাঝেই থেকে পুরো পরিবেশ উপভোগ করতে পারবেন।

মাঝারি মানের হাউসবোটে থাকতে গেলে প্রায় 4500-5000 হাজার টাকা মতো পড়ে। আর যদি একটু বিলাসবহুল বড় হাউসবোটে থাকতে চান, অফ-সিজনে সেটার ভাড়া প্রায় সাত থেকে আট হাজার টাকা পার পারসন হতে পারে। তবে সিজনে এই ভাড়া বেড়ে প্রায় ১৫-১৬ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

আমরা যে হাউসবোটে ছিলাম সেটার নাম ছিল The Haor Sail Houseboat। অফ-সিজনে এর ভাড়া ছিল প্রায় আট হাজার টাকা পার পারসন। এখানে ২৪ ঘণ্টা এয়ার কনডিশন, মিনারেল ওয়াটার, এমনকি হাউসবোটের ওপর একটা ছোট সুইমিং পুলও ছিল। রুমগুলো খুবই সুন্দরভাবে ডেকোরেটেড ছিল, খাবারের মানও ছিল চমত্কার এবং তারা সবসময় বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করেছে।

হাউসবোটে রাতের বেলায় গান-বাজনার আয়োজনও থাকে, যা পুরো ট্রিপকে আরও আনন্দদায়ক করে তোলে। সবমিলিয়ে, একটি ভালো মানের হাউসবোট আপনার পুরো হাওর ভ্রমণকে আরও আরামদায়ক ও স্মরণীয় করে তুলবে।
টাঙ্গুয়ার হাওরের আশেপাশের দর্শনীয় স্থান/Nearby Tourist Spots Around Tanguar Haor
যাদুকাটা নদী/Jadukata River

যাদুকাটা নদী (বা যদুকাটা নদী, জাদুকাটা-রক্তি নদী নামেও পরিচিত) বাংলাদেশ-ভারতের একটি আন্তঃসীমান্ত নদী। নদীটির উৎপত্তি ভারতের খাসিয়া-জৈন্তিয়া পাহাড় থেকে, পরে এটি বাংলাদেশের সুনামগঞ্জ জেলার বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় প্রবেশ করেছে। প্রায় ৩৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদীর গড় প্রস্থ প্রায় ৫৭ মিটার এবং এর প্রকৃতি সর্পিলাকার, যা নদীটিকে আরও অনন্য করে তুলেছে।

জাদুকাটা নদীর মূল আকর্ষণ হলো এখান থেকে ভারতের মেঘালয়ের পাহাড়গুলো দেখা যায়। পাহাড়ের চূড়ায় শুভ্র মেঘ ভেসে থাকে, আর এই পাহাড়, মেঘ এবং সবুজ পরিবেশ মিলে একেবারে জাদুময় সৌন্দর্য্য় তৈরি করেছে, যা ভ্রমণপিপাসুদের ভীষণ আকর্ষণ করে।
লাকমাছড়া (Lakmachora)

সুনামগঞ্জের অন্যতম একটি দর্শনীয় স্থান। এই জায়গার বিশেষত্ব হল, এর এক পাশে বাংলাদেশ, আরেক পাশে ভারত। ভারতের লাকমাছড়া ঝর্ণার ঠান্ডা জল এই ছড়া দিয়ে নেমে আসে। ছড়া বলতে মূলত সেই পথকেই বোঝায়, যেখানে ঝর্ণার পানি বয়ে আসে।
এই অঞ্চল থেকে ঝর্ণা সরাসরি দেখা না গেলেও চারপাশের সবুজ পাহাড় এবং মেঘের অপূর্ব মিলনমেলা ভ্রমণপ্রেমীদের মুগ্ধ করে। এখানে পাহাড়ের উপরে সাদা মেঘ ভেসে থাকা এক অনন্য সুন্দর দৃশ্য তৈরি করে। আর এই পরিবেশেই পাহাড়, মেঘ আর অরণ্যের এক দারুণ মিশ্রণ ঘটে, যা ভ্রমণকারীদের জন্য এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা এনে দেয়।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা ভালো, এটি মূলত নো-ম্যানস ল্যাান্ড এরিয়া, যেখানে বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তরেখা রয়েছে। তাই আন্তর্জাতিক সীমা অতিক্রম না করার ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। যদিও এখানকার নিরাপত্তার জন্য বিজিবি ক্যাম্প রয়েছে, তারপরও এই বিষয়গুলো মাথায় রেখে ঘোরা ভালো।
নীলাদ্রি লেকের মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য/Niladri Lake

নীলাদ্রি লেক, যেটি প্রকৃতপক্ষে শহীদ সিরাজ লেক নামে পরিচিত, সুনামগঞ্জের তাহেরপুর উপজেলার শ্রীনগর ইউনিয়নের টেকেরঘাট নামক এলাকায় অবস্থিত। এটি মূলত লেমনাইট বা লাইমস্টোনের খনির জলাধার, যা এখন একটি পর্যটন আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।

এই লেকের স্বচ্ছ নীল পানি, চারপাশের সবুজ পাহাড় আর প্রশান্ত পরিবেশ একে এক অনন্য সৌন্দর্য দেয়। এখানে এসে মনে হবে আপনি প্রকৃতির এক অপার্থিব সৌন্দর্যের মধ্যে রয়েছেন, যেখানে নীল জলরাশি আর সবুজ পাহাড় মিলেমিশে এক স্বর্গীয় অনুভূতি তৈরি করে।

নিলাদ্রি লেকের আরেকটি চমৎকার দিক হল এখানে ছোট ছোট নৌকা নিয়ে পুরো লেকটা ঘুরে দেখা যায়। ছবিতে যেমন সুন্দর দেখায়, বাস্তবে এর চেয়েও অনেক বেশি সুন্দর লাগে। নৌকার ভাড়া খুব একটা বেশি নয়, জনপ্রতি আনুমানিক ৬০ থেকে ৭০ টাকা মতো পড়ে। তাই আপনি সহজেই এই ছোট নৌকাগুলো নিয়ে পুরো লেকের পরিবেশটা ঘুরে দেখতে পারেন এবং প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন।
সুড়ঙ্গ ঝরনার রহস্যময় সৌন্দর্য

শুরুতেই বলি, স্থানীয়দের কাছে এই ঝরনাটিকে “সুড়ঙ্গ ঝরনা” বলা হয়। কারণ, এটি আসলে নীলাদ্রি লেক থেকে প্রায় ১৫ মিনিটের মতো পাহাড় বেয়ে ট্রেকিং করলেই পাওযা যায়। ঝরনাটি এমন একটি গোলাকার সুড়ঙ্গের মতো জায়গা থেকে উঠে আসে, আর এর পানি অসাধারণ স্বচ্ছ ও ঠান্ডা।

আমরা নিজেরাই পানি টেস্ট করে দেখেছি, এবং এর স্বচ্ছতা ও স্বাদ যেন মিনারেল ওয়াটারের চেয়েও ভালো। ঝরনাটি কোথা থেকে ঠিক উঠে আসে, সেটা পুরোপুরি জানা না গেলেও, এই শুরুঙ্গো ঝরনার মায়াবী দৃশ্য দেখতে অনেকেই এখানে আসেন।
Watch Tower Tanguar Haor

টাঙ্গুয়ার হাওরের ওয়াচটাওয়ার হলো এমন একটি জায়গা যেখান থেকে পুরো হাওরের মনোরম দৃশ্য দেখা যায়। এই ওয়াচটাওয়ার এরিয়া বিশেষভাবে আকর্ষণীয় কারণ পানির মধ্যে সারি সারি গাছ দেখা যায়, আর পানি কম থাকায় অনেক ভ্রমণকারী এখানে নেমে গোসলও করেন। নীল জল আর সবুজ গাছপালার এই মিশ্রণ ভ্রমণপিপাসুদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা তৈরি করে।

তবে এখানে নামার সময় কিছু সতর্কতা রাখা ভালো, কারণ পানির নিচের মাটি বেশ পিচ্ছিল, আর গাছের শেকড়ে পা কেটে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আগে হাউসবোটগুলো সরাসরি ওয়াচটাওয়ারের কাছে যেতে পারলেও এখন সরকারি নিয়মের কারণে সেগুলো একটু দূরে নোঙর করে। সেখান থেকে ছোট নৌকায় চড়ে ওয়াচটাওয়ারে যেতে হয় এবং ঘুরে এসে ফের হাউসবোটে ফেরা যায়।

এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য যে আমরা ওয়াচটাওয়ারে যাওয়ার জন্য ছোট নৌকা নিয়েছিলাম, যার ভাড়া প্রতিজন প্রায় ৭০ থেকে ৮০ টাকার মতো পড়ে। কখনো কখনো ভিড় বা সময়ভেদে এই ভাড়া একটু বাড়তেও পারে, তখন জনপ্রতি আনুমানিক ১০০ টাকার মতো লাগতে পারে। তাই এটা মাথায় রেখেই পরিকল্পনা করলে ভালো হয়।
টাঙ্গুয়ার হাওর ভ্রমণের অসুবিধা ও করণীয়/Tanguar Haor Travel: Inconveniences and Tips

টাঙ্গুয়ার হাওরে যাতায়াতের পথে কিছু অসুবিধা ও সমস্যার মুখোমুখি হতে হতে পারে। আমরা সেপ্টেম্বর 2025 মাসে ভ্রমণ করেছিলাম এবং তখন ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে প্রচণ্ড যানজটের মুখোমুখি হই। আশুগঞ্জ অংশে যানজট সবচেয়ে বেশি হয়, যেখানে কখনো কখনো ৪ থেকে ৮ ঘণ্টা কিংবা তারও বেশি সময় আটকে থাকতে হতে পারে। তাই ভ্রমণ পরিকল্পনার সময় এ বিষয়টি মাথায় রাখা জরুরি।

রাস্তায় কিছু অংশ ভালো হলেও কিছু অংশ খানাখন্দযুক্ত এবং অস্বস্তিকর। এজন্য বিশেষ করে ৫০ বছরের বেশি বয়স্ক ভ্রমণকারীদের জন্য এ ভ্রমণ কষ্টকর হতে পারে।
এই কয়েকটি অসুবিধা ছাড়া টাঙ্গুয়ার হাওর ভ্রমণে বড় কোনো সমস্যা নেই। বরং কিছু টিপস মাথায় রাখলে ভ্রমণটা আরও সহজ এবং আরামদায়ক হয়:
- সম্ভব হলে গ্রুপে ভ্রমণ করুন। এতে বাজেট সাশ্রয় হবে এবং অভিজ্ঞতাও ভালো হবে।
- হাউসবোটে থাকার পরিকল্পনা থাকলে আগে থেকেই বুকিং নিশ্চিত করুন। সুনামগঞ্জে গিয়ে সরাসরি হাউসবোট পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
- ভ্রমণের আগে অবশ্যই বাসের টিকিট অগ্রিম কেটে রাখুন। বিশেষ করে রাতের বাসে যাত্রা করলে সহজেই ভোরে পৌঁছানো যায় এবং দিনের বেশিরভাগ সময় ঘোরাঘুরি করা সম্ভব।
- দেরি হলে অনেক সময় নির্দিষ্ট কিছু স্পট মিস করার ঝুঁকি থাকে, তাই সময় ব্যবস্থাপনাকে গুরুত্ব দিন।
আপনি যদি ঢাকার দর্শনীয় স্থানগুলোর আরও তথ্য জানতে চান, তাহলে এখানে আমাদের ব্লগের একটি বিভাগ রয়েছে: Dhaka’s Tourist Spots



